মানহীন ও নষ্ট সার বাজারজাত করছে নোয়াপাড়া গ্রুপ 

426
মানহীন ও নষ্ট সার

যশোরের প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ কিছুই জানেনা

বিশেষ প্রতিনিধি : যশোরের নোয়াপাড়া গ্রুপের বিরুদ্ধে জমাটবাঁধা, পানিতে ভেজা, মানহীন ও নষ্ট সার বাজার জাত করার অভিযোগ উঠেছে। ওই নষ্ট সার ব্যবহার করে প্রতারিত হচ্ছে কৃষক সমাজ। দীর্ঘ এক মাস ধরে ৪০ হাজার বস্তা সার তারা বাজারে সরবরাহ করে আসছে। অথচ যশোরের প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ কিছুই জানেনা।

ভিজে যাওয়া ও জমাট বাধা মানহীন এ সার বাজারজাত করে কৃষক সমাজের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নোয়াপাড়া গ্রুপ। অথচ নষ্ট ও জমাট বাধা সার বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে।

অভিযোগে জানা গেছে, দেশের সার ব্যবসায়ী হিসেবে নোয়াপাড়া গ্রুপের যথেষ্ঠ সুনাম রয়েছে। এই সুনামকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন তারা কৃষকের সাথে প্রতারণা করে আসছে। ২০১৯ সালে বিএডিসি মরক্কো থেকে ডিএপি সার আমদানী করে। আমদানীকৃত সার বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের মাধ্যে দেশের প্রান্তিক চাষিদের কাছে পৌছানোর কথা। কিন্তু নোয়াপাড়া গ্রুপ অধিক মুনাফা লাভের আশায় ডিলাদের বরাদ্দকৃত সার সরবরাহ না করে দেশে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। ওই গ্রুপ আমদানিকৃত সার যশোরের অভয়নগর উপজেলার আলিপুর নামক স্থানে ড্যাম্পিং করে। পরে ওই প্রতিষ্ঠান সরকারের নির্ধারিত মুল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে আসছে। যা এখনো পর্যন্ত অব্যহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গোপনে মজুতকৃত ওই সার চলতি বছরে বৃষ্টিতে ভিজে নষ্টও হয় এবং জমাট বেধে যায়। এতে করে সারের গুণাগত মান নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু চলতি বোরো মৌসুমে গত বছর (২০১৯) মরক্কো থেকে আমদানীকৃত গুণগত মান নষ্ট হওয়া ওই ডিএপি সার গুড়া করে ও বস্তা পরিবর্তন করে ডিলারদের কাছে সরবরাহ করছে।

ডিলাররা সেই সার কৃষকদের কাছে পৌছে দিচ্ছে। কৃষকরা ওই সার কিনে প্রতারিত হচ্ছে। এতে করে জমির উর্বর শক্তিও নষ্ট হচ্ছে।

কৃষির সাথে সম্পৃক্ত সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ডিলারের কাছে বিক্রি করছে নোয়াপাড়া গ্রুপ। ভিজে যাওয়া ও জমাট বাধা এ সার কিনে দেশের চাষিরা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তেমনি ফসল উৎপান ব্যহত হবে।

দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে কাজ করতে আসা কয়েকজন শ্রমিক জানান, গত এক মাসে আলিপুরের এ সারে ড্যাম্প থেকে প্রায় ৪০ হাজার বস্তা ভিজা ও জমাট বাধা সার ভেঙ্গে রৌদে শুকিয়ে নতুন বস্তায় ভরেছে। ওই সার প্রতিদিন ট্রাকযোগে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ডিলারদের মাধ্যমে চলেগেছে। আর ডিলারদের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক চাষিদের কাছে পৌছে গেছে নষ্ট এ সার। আগামী বোরো মৌসুমে ফসল নিয়ে চাষিদের মাথায় হাত উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, প্রতি বস্তা ডিএপি সারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ৮৫০ টাকা। কিন্তু নোয়াপাড়া গ্রুপ ওই সার কালো বাজারের মাধ্যমে হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ। নোয়াপাড়া গ্রুপের দাবিকৃত টাকা না দিলে ডিলারদের সাথে করা হয় অসৌজন্য মূলক আচারণ। দাবিকৃত টাকা দিলেই তারা সার সরবরাহ করে।

বিএডিসি’র মরক্কো ডিএপি সারের বিষয়ে একাধিক বিসিআইসি ডিলারের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, চলতি বোরো মৌসুমের আমদানিকৃত সার নোয়াপাড়া গ্রুপে কিনতে এসে বিভিন্নভাহে হয়রাণির শিকার হতে হয়েছে। এছাড়া তাদের নামে বরাদ্ধকৃত সারও নোয়াপাড়া গ্রুপ দেয়নি। তারা আরো জানায়, তাদের মোট বরাদ্ধকৃত সারের শতকরা ১৫ ভাগ সার কেটে নিয়েছে গ্রুপটি। এতে করে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ এ গ্রুপের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে আর সার না দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে হয়রাণি করা হয়। এ ভয়ে কোন সার ডিলার কিম্বা ব্যবাসায়ী নোয়াপাড়া গ্রুপের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায়না।

বিসিআইসি ডিলাররা আরো জানান, তাছাড়া বরাদকৃত সার আনতে গিয়ে বস্তা প্রতি সাড়ে তিন টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে। এক বস্তায় সারে যদি এভাবে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় তাহলে একটি ছোট ট্রাকে সাড়ে চারশ’ বস্তা সার যায় তাহলে অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকা গুনতে হয়।

বুধবার সরেজমিনে আলিপুরের এ সার ড্যাম্পে গিয়ে দেখা যায় সেখানে শ্রমিকরা গুণাগত মান নষ্ট হওয়া ওই ডিএপি সার গুড়া করে ও বস্তা পরিবর্তন করতে দেখা যায়। পরে কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার মিজানুর রহমান জনি জানান, কোম্পানির কোন জায়গায় আপনাকে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। প্রবেশ করতে হলে আপনারা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে আসেন। মন্ত্রণালয় যদি আপনাদের অনুমতি দেয় তাহলে আপনারা প্রবেশ করতে পারবেন।

তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, আপনারা যদি সংবাদ প্রকাশ করেন তাহলে আমরা সারা দেশে সার সরবরাহ বন্ধ করে দেব। এ নিয়ে আমরা সংবাদ সম্মেলন করবো। এসময় জনির সাথে থাকা গ্রুপের অন্য কর্মকর্তারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে ভেজাল ও নিম্ন মানের সারের বস্তার উপরে ভালো মানের সারের ড্যাম্পিং করে রেখেছে নোয়াপাড়া গ্রুপ।

যশোর জেলা বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান বলেন, সার নিয়ে গত মিটিংয়ে কথা হয়েছে। সেখানে সার ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে নোয়াপাড়া গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছে। আমরা দুই এক দিনের মধ্যে নওয়াপাড়ায় অভিযান শুরু করবো।

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সার রোদে কিম্বা বৃষ্টিতে ভিজলে এর গুনাগত মান নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি বিপণন এ ব্যাপারে কঠোর। যে গ্রুপই হোক না কেন, মাটি কিম্বা কৃষকের সাথে প্রতারণা করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই পানিসমেন্ট ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমরা খবর নিচ্ছি। যদি কোন অপরাধের সাথে নোয়াপাড়া গ্রুপ যুক্ত থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকের সাথে কেউ প্রতারণা করলে তার ছাড় নেই। কৃষকের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি করবে আর কৃষি বিভাগ বসে থাকবে এটা ভাবার কোন বিষয় না। আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এ ব্যাপারে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, সার সঙ্কট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। নোয়াপাড়া গ্রুপ যদি কোন অপকর্ম বা অপরাধ করে তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। ইতিমধ্যে যশোরের বিভিন্ন এলাকায় সার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, নষ্ট ও জমাট বাধা সারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অব্যশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

আরো পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালে বেবী নাজনীন
ডোকলামের কাছেই গ্রাম তৈরি করছে চীন, চিন্তা বাড়ছে ভারতের
শিশুদের বাঁচাতে করোনাকালে ৪২ লিটার বুকের দুধ দান করলেন এই নারী

মানহীন ও নষ্ট সার / স্বাধীন কণ্ঠ 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here