সংগ্রামী আত্মসম্মানী জীবনের প্রতিচ্ছবি খুকি

385
সংগ্রামী আত্মসম্মানী জীবনের প্রতিচ্ছবি খুকি

‘জন্ম নেয়া সহজ, জীবন বড় কঠিন। জীবন একটি নৌকার মতো, যাকে তার তীরের সন্ধান করতে হয়; আমি একটি জলন্ত মোমবাতি কখন যে নিভে যাব জানি না। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত জ্বলবো।’ কবিতা আবৃত্তির মতো করে ছন্দে ছন্দে এ সব কথা বলেন- রাজশাহীর পত্রিকা বিক্রেতা দিল আফরোজ খুকি।

খুকি জানান, ‘তিনি মানুষের কাছে খবরের কাগজ নিয়ে যান, যাদের বেশিরভাগ তার আত্মমর্যাদার জন্য লড়াইয়ের কথা না জেনে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। অন্যের উপর নির্ভরশীল জীবন যে কত কষ্টের!’

খুকি বলেন, ‘আমি খবরের কাগজ বিক্রি করে নিজের জীবন চালাচ্ছি, এটা কি অসম্মানের? এটা কিভাবে অন্য কারও মানহানী করে? কোনও কাজই তো ছোট নয়।’

বিগত তিরিশ বছর ধরে সংবাদপত্রের হকার দিল আফরোজ খুকি। ষাটের কাছাকাছি বয়সেও তিনি এখন সংবাদপত্র বিক্রি করে চলেছেন। বিত্তশালী পরিবারে তার জন্ম বা একজন নারী হওয়া তার সংগ্রামের পথে কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

রাজশাহী নগরের শিরোইল এলাকায় তার বাড়ি। এজেন্টদের কাছ থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ করেন সকালেই। সারাদিন ধরে তিনি শহরের বিভিন্ন রাস্তায়, অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে সংবাদপত্র বিক্রি করেন। মাইলের পর মাইল হাঁটেন। তার কাঁধে ঝুলে থাকে একটি কাপড়ের ব্যাগ, যাতে থাকে সংবাদপত্র।

১৯৮০ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবার আত্মীয়-স্বজন তাকে গৃহ ছাড়া করেন। ভাইদের আপত্তিতে বাবার বাড়িতেও ঠাঁই হয়নি তার। এরপর থেকেই কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন খুকি। পাগলী বলে তাকে কেউ আশ্রয়ও দেয়নি। এমনকি অনেকে মারধরও করেছেন। তবুও কারও দয়ার পাত্রী না হয়ে বেছে নেন সংবাদপত্র বিক্রির পেশা।

উচিত কথা বলার জন্য, নিজের জন্য মুক্ত জীবন বেছে নেয়ার কারণে অনেকে তাকে না বুঝেই ‘পাগলী’ বলে ডাকে, উপহাস করে, লাঞ্ছনা করে। তবুও দমে যান না খুকি। চলার পথে কারও অভাব দেখলেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। যাদের তিনি সাহায্য করেন, তারা বেশিরভাগই নারী। অনেককে নগদ অর্থ ধারও দেন দিল আফরোজ খুকি।

সংবাদপত্র হকারী করেই বহু মেয়েকে সেলাই মেশিন এবং তাদের স্বামীদের সাইকেল কিনে দিয়েছেন খুকি। কোনওরকম বৈষম্য না করে নিয়মিত এতিমখানা, মসজিদ এবং মন্দিরে দানও করেছেন। এমনকি বেশ কয়েকটি পরিবারকে গবাদি পশু কিনে দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন এই ‘খুকি পাগলী’।

এ বিষয়ে দিল আফরোজ খুকি বলেন- ‘আমি যাদের দান করেছি, তাদের বেশিরভাগেরই নাম মনে নেই। আজকাল আমি কোনও অভাবী ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে বেশি হাঁটতেও পারি না।’

শামস-উর রহমান রুমি নামে দিল আফরোজ খুকির এক ভাগ্নে জানান- খুকি সাত বোন এবং পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দশম। আশির দশকে টাঙ্গাইলের ভারতেশ্বরী হোমস-এ পড়াশুনা করেছেন। অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল এবং বিধবা হয়েছিলেন সেই অল্প বয়সেই। তিনি তার স্বামীর মৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বিপর্যয় থেকে বাঁচতে দ্বিতীয় বিয়ে না করেও স্বাবলম্বী হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন খুকি।

১৯৯১ সালে তিনি তৎকালীন এবং এখন বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজশাহীর আঞ্চলিক ‘সাপ্তাহিক দুনিয়া’ পত্রিকা বিক্রি করা শুরু করেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহমেদ শফি উদ্দিন সাপ্তাহিকটির অন্যতম কর্ণধার ছিলেন।

রুমি জানান, খুকির এক বোনের স্বামী আবদুল আজিজ তাকে আহমেদ শফি উদ্দিনের কাছে নিয়ে যান, খুকির জন্য একটি চাকরীর অনুরোধ নিয়ে।

আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, ‘খুকির বয়স তখন কুড়ির ঘরে। তিনি লিখতে জানতেন না বলে আমি তাকে তখন চাকরি দিতে পারিনি। আমি রসিকতা করে তাদের বলেছিলাম যে, আমি তার জন্য হকার হওয়া ছাড়া আর কোনও কাজ খুঁজে পাচ্ছি না।’

আহমেদ শফি বলেন, কয়েকদিন পর, খুকি আমাদের অফিসে এসে হাজির। বেঁচে থাকার জন্য চাকরিটা তার দরকার বলে জোর করতে থাকলেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি ২০ কপি দিয়ে শুরু করে সপ্তাহে ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতে সময় নেননি। আমরা তাকে এ জন্য স্বর্ণপদক দিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে তিনি শহরের অন্যান্য স্থানীয় দৈনিক বিক্রি শুরু করেন।’

আহমেদ শফি উদ্দিন আরও বলেন, ‘তার ভাল আচরণ, সুন্দর করে কথা বলা, নিয়মানুবর্তীতা এবং গ্রাহকরা তার কাছ থেকে কাগজ কেনা পছন্দ করতেন। তখন বয়সে যুবতী হওয়ার কারণে তাকে বারবার রাস্তায় হয়রানি ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল। তবুও তিনি থেমে যাননি।’

নগর সংবাদপত্র হকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জামিউল করিম সুজন বলেন, ‘খুকি এখনও প্রতিদিন ৩০০টিরও বেশি কপি খবরের কাগজ বিক্রি করেন। আগে আরও বেশি বিক্রি করতেন। যদিও ইন্টারনেটের অগ্রগতিতে এখন সংবাদপত্রের বিক্রি কমেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুকি সবসময় নগদ টাকা দিয়ে খবরের কাগজ কিনেন, কখনও বাকী রাখেন না। কারও কাছ থেকে সহায়তা নেন না, নেয়াটা অসম্মান বলে মনে করেন। বরং তিনি যাদের প্রয়োজন তাদেরকেই দান করেন।’

দিল আফরোজ খুকি এখন তার পৈতৃকপ্রাপ্ত সম্পত্তিতেই বসবাস করছেন। স্থানীয়রা জানান- খুকির কিছু আত্মীয় তাকে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেছিল। তবে এলাকাবাসী তাকে কেবল এই বাড়ি পেতে সহায়তা করেছিল।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খুকির ভাগ্নে শামস-উর-রহমান রুমি বলেন, খালার জন্য তাদের পরিবারের সদস্যরা বিব্রত। তিনি সহায়তা নেয়া পছন্দ করেন না এবং প্রতিবেশীরা দেখেন যে পরিবার তাকে সহায়তা করছে না। তবে যখন তার সত্যিকারের প্রয়োজন হয়, তখন পরিবারের সদস্যরাই তার যত্ন নেয়, প্রতিবেশীরা তখন আসেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here