২০২০ সালের সিলেটের আলোচিত তিনটি ঘটনা

356
২০২০ সালের সিলেটের আলোচিত তিনটি ঘটনা

ইবাদুর রহমান জাকির: তিনটি পৃথক ঘটনা। ঘটনাস্থল সিলেট। তবে এ তিনটি ঘটনা ছুঁয়ে গেছে দেশের প্রতিটি মানুষকে। নেতিবাচক সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে সিলেটকে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ জনিয়ে দেশ-বিদেশে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় বইয়ে গেছে। বিদায়ী বছরে এ তিনটি ঘটনাই সিলেটকে লজ্জার মুখোমুখি ফেলেছে।

চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী। স্বামীকে বেঁধে ওই নারীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে তারা। ঘটনার পর অভিযুক্তরা আলামত মুছে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে পালিয়ে যায়।

এ বিষয়টি গণমাধ্যকর্মীদের বদৌলতে মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। দোষীদের দ্রত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মুখর হন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দেশ-বিদেশে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়। এ ঘটনায় ওই গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে সিলেট মহানগরের শাহপরান থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পর অভিযুক্ত আটজন আসামি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। এ ঘটনায় গত ৩ ডিসেম্বর পুলিশ আটজনকে অভিযুক্ত করে আদালাতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। ঘটনার পরপরই সিলেটের সচেতন নাগরিকেরা বিভিন্ন প্রতিবাদ সমাবেশে অভিযোগ করেন, এর আগে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাস পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটলেও বিচার হয়নি। এ কারণে অপরাধীরা পুনরায় ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাতে সাহস পেয়েছে। যদি আগের ঘটনার বিচার দ্রততার সঙ্গে শেষ করা যেত, তাহলে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানোর সাহস পেত না অপরাধীরা।

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পরপরই টিলাগড় কেন্দ্রিক দুবৃত্তপনা ও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার বিষয়টি নতুনভাবে আলোচিত হতে শুরু করে। এসব অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ এবং আওয়ামী লীগ নেতা আইনজীবী রণজিত সরকারের বিরুদ্ধে। উভয় নেতাই টিলাগড় এলাকার বাসিন্দা। যদিও এসব অভিযোগ আজাদ এবং রণজিত গণমাধ্যমের কাছে অস্বীকার করে জানান, তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ সত্য নয়। তাঁরা ক্যাডার ভিত্তিক কোনো রাজনীতি করেন না। টিলাগড়ে কোনো অঘটন ঘটলে অযথাই তাঁদের নামে অভিযোগ ছড়ায়।

এমসি কলেজের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরের মাসে সিলেট মহানগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান আহমদ নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নগরের আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হানকে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরদিন তাঁর মৃত্যু হলে রায়হানের স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপরই সিলেটসহ দেশজুড়ে দোষী পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন তৈরি হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর টক শো গুলোতে পুলিশি হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনাটি দিনের পর দিন আলোচিত হতে থাকে।

সার্বিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ অনুসন্ধান করে রায়হানের মৃত্যুর জন্য কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যের সম্পৃক্ততা খোঁজে পায়। এ ঘটনায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তর করা হয়।

অন্যদিকে রায়হানের ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পান। তবে ১২ অক্টোবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যান অভিযুক্ত আকবর। ৯ নভেম্বর তাকে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে বরখাস্ত কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশিদ এবং প্রত্যাহার হওয়া এএসআই আশেক এলাহীকে গ্রেপ্তার করা হয়। শীঘ্রই এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চলতি বছর যে তিনটি ঘটনা সিলেটকে সংবাদের শিরোনামে পরিণত করেছেন, এর সর্বশেষটি হলো টানা তিনদিন সিলেট নগরসহ সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন থাকা। চলতি বছরের ১৭ নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টার দিকে সিলেট সদর উপজেলার কুমারগাঁও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওইদিন বেলা পৌনে একটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে তিন দিন সময় লাগে।

বিদ্যুতের অভাবে এ সময়টাতে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নগরে পানি সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে নগরজুড়ে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। পাশাপাশি পুরো সিলেট অন্ধকারে ডুবে থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাদের।

সিলেটের বিদ্যুতের গ্রাহক ও সচেতন বাসিন্দারা তখন অভিযোগ করেন, বিভাগীয় শহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকেন্দ্রে আগুন লাগার তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে, এটি মেনে নেওয়ার মতো নয়। এতে বিদ্যুৎ বিভাগের অদক্ষতারই প্রতিফলন পাওয়া গেছে।

এছাড়া উপকেন্দ্রের মতো স্থানে কীভাবে আগুন ছড়ায়, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। অন্যদিকে ঘটনার পরপরই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ তুলেছেন, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার ফলেই অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ হয়ে ছড়িয়েছে। এছাড়া এখানে কর্মরতদেরও অবশ্যই গাফিলতি রয়েছে। নতুবা অগ্নিকাণ্ড এত ভয়াবহতা কখনোই পেত না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here